অবশেষে দেখতে দেখতে সেই দিনটা চলেই এলো। কাল থেকেই কিন্তু শুরু হচ্ছে তোমার জীবনের অন্যতম বড় পরীক্ষা এইচএসসি ২০২৬। এতদিন কেমন পড়েছো কিংবা কতটা সিলেবাস শেষ করতে পেরেছো তা নিয়ে এখন আর একদমই ভাবার দরকার নেই। পরীক্ষার আগের এই শেষ রাতটা মূলত নিজেকে শান্ত রাখার আর গুছিয়ে নেওয়ার রাত। তাই অযথা টেনশন করে একটা লম্বা জার্নির এই শুরুটাকে নষ্ট করে ফেলার কোনো প্রয়োজন নেই।
সন্ধ্যার পর আবার নতুন করে শুরু থেকে সব ভালোমতো রিভিশন করার শক্তি নাও থাকতে পারে বা বোর লাগতে পারে। আবার অনেকের মনে হতে পারে যে আমার এখন কিছুই মাথায় আসছে না, কিছুই মনে নেই। একদম প্যানিকড হবে না, এটা খুবই নরমাল একটা ব্যাপার। তাই এই সময়টা ব্রেইনকে অতিরিক্ত প্রেশার না দিয়ে সব কাজ গুছিয়ে দ্রুত শুয়ে পড়ার চেষ্টা করো। চাইলে এই সময়টাতে হালকা পোল সলভ কিংবা এমসিকিউ কোশ্চেন প্র্যাক্টিস করতে পারো।
আজ রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো তোমার এক্সাম কিট বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রগুলো একটা ট্রান্সপারেন্ট ফাইলে গুছিয়ে ফেলা। ফাইলের ভেতর তোমার অ্যাডমিট কার্ড আর রেজিস্ট্রেশন কার্ডের মূল কপি, অন্তত তিনটা সচল কালো বলপেন, পেন্সিল, স্কেল এবং অবশ্যই একটি সচল এনালগ ঘড়ি আগে থেকেই রেডি করে রাখবে। রাতের খাবারটা ৯টার মধ্যে খেয়ে নেবে। ঘুমানোর আগে কাল সকাল ৭টার মধ্যে কী কী রিভিশন করে যাবে এবং কোনটার জন্য কতক্ষণ করে সময় নেবে তা এখনই ডিসাইড করে রাখো। এরপর ঘুমানোর অন্তত ২-৩ ঘণ্টা আগে থেকে কোনো ধরনের ডিভাইস বা ফোন দেখা একদম বন্ধ করে দাও। কারণ ডিভাইসের আলো ঘুমে মারাত্মক ইফেক্ট ফেলে এবং দ্রুত ঘুমাতে দেয় না। পরীক্ষার আগের রাতে এমনিতেই কিছুটা টেনশন কাজ করে যার ফলে ঘুমাতে দেরি হতে পারে, তার ওপর এমন কিছু করা যাবে না যা তোমার দ্রুত ঘুমাতে বাধা দেয়। মনে রাখবে, পরীক্ষার আগের রাতে মিনিমাম ৭ ঘণ্টা ঘুম একদম বাধ্যতামূলক। ঘুমানোর আগে একটু পায়চারি অথবা লাইট এক্সারসাইজ করে ১০টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়বে।
দ্রুত ঘুমিয়ে ৭ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করে সকালে সময়মতো উঠে ফযরের সলাত আদায় করবে। সলাত শেষে কিছুক্ষণ কুরআন তিলওয়াত করে আল্লাহর কাছে মন থেকে বেশি বেশি দুআ করার মাধ্যমে তোমার সকালটা শুরু করবে। তারপর হালকা নাস্তা করে আগের রাতে ডিসাইড করে রাখা পড়াগুলো একবার সময় ভাগ করে সকাল ৭টার মধ্যে শেষ করে ফেলবে। মূল বই, ভুলের খাতাসহ এক্সামের দিন সকালে যা যা পড়বে বলে আগে থেকেই গুছিয়ে রেখেছিলে, ঠিক সেগুলোই পড়বে। মনে রাখবে, এটাই কিন্তু এই পরীক্ষার জন্য তোমার শেষ পড়া। পড়া শেষ করে অযথা টেনশন না করে দ্রুত গোসল করে নেবে এবং সকালের নাস্তাটা সুন্দর মতো শেষ করবে। ভুলেও খালি পেটে এক্সাম হলে যাওয়া যাবে না। খাওয়ার পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবে। মানে খাওয়ার পরপরই তাড়াহুড়ো না করে একটু যেন রিল্যাক্সড হয়ে তারপর এক্সামের উদ্দেশ্যে রওনা হতে পারো, সেই ভাবেই নিজের টাইম ম্যানেজমেন্ট করবে।
যেহেতু এখন বর্ষাকাল এবং যেকোনো সময় হুট করে বৃষ্টি নামতে পারে, তাই সাথে অবশ্যই একটা ছাতা রাখবে। রাস্তার জ্যাম কিংবা বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে নিজের সেন্টার বুঝে পরীক্ষা শুরুর মিনিমাম ১ ঘণ্টা আগে যেন সেন্টারে পৌঁছাতে পারো, সেভাবেই বাড়ি থেকে বের হবে। যানবাহনে চলার সময়, হাঁটার সময় কিংবা সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে বই নিয়ে উন্মাদের মতো পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। সেখানে গিয়ে বন্ধুদের সাথে “তোর কতটুকু পড়া হলো?” এই জাতীয় কথা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলবে। কারও সাথে কার প্রিপারেশন কেমন এগুলো জিজ্ঞেস করে অন্যের সাথে নিজের কম্পেরিজন কোনোভাবেই করবে না। এই সময়টা মাথা একদম ঠান্ডা রাখবে এবং ব্রেনকে রেস্ট দেওয়ার চেষ্টা করবে। কারও সাথে কোনো ফালতু কথা বলার প্রয়োজন নেই। মনে মনে বেশি বেশি আল্লাহর কাছে দুআ করবে যেন তিনি তোমার পরীক্ষাটা তোমার জন্য সহজ করে দেন।
পরীক্ষার হলে ওএমআর আর মূল খাতা পাওয়ার পর প্রথম কাজ হলো রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং বিষয় কোড সঠিকভাবে লিখে বৃত্ত ভরাট করা। যদি কোনো কারণে এখানে কোনো ভুল হয়েও যায়, তাহলে একটুও সংকোচ না করে সাথে সাথে রুমে থাকা ডিউটিরত টিচারকে জানাবে এবং ওনার পরামর্শ নেবে। এরপর মূল খাতায় সুন্দর করে মার্জিন দিয়ে রাখবে। এমসিকিউ কোশ্চেন পাওয়ার পর প্রথম কাজ হলো সেট কোড সঠিকভাবে পূরণ করা, তারপর পরীক্ষা শুরু করবে। এমসিকিউ কোশ্চেন কয়েক রাউন্ডে শেষ করবে। প্রথম রাউন্ডে একদম ইজি আর শতভাগ শিওর পারা কোশ্চেনগুলো দাগাবে। ভুলেও কোশ্চেনে কলম দিয়ে দাগাবে না। আর শুধু অপশন মার্ক করে রেখে এক্সামের শেষ কয়েক মিনিটে এসে ওএমআর পূরণ করার কথা চিন্তাও করবে না। যেগুলো পারবে সাথে সাথে কলম দিয়ে ওএমআর শিটে বৃত্ত ভরাট করে ফেলবে। যেগুলো প্রথমবারে পারবে না বা বেশি ভাবতে হবে সেগুলো নিয়ে পরে না থেকে ওইগুলো কোশ্চেনে ছোট করে গোল দিয়ে পরের কোশ্চেনে চলে যাবে। তারপরের রাউন্ডে ওই কোশ্চেনগুলো আনসার করার চেষ্টা করবে। এরপরের রাউন্ডে যেগুলো একদমই পারছ না তবে মনে হচ্ছে এই উত্তরটা হতে পারে, সেটা দাগিয়ে আসবে। ভুলেও কোনো আনসার ফাঁকা রেখে আসবে না। এমসিকিউয়ের ক্ষেত্রে অপশন টেস্ট খুব বড় একটা টুল, তাই যেগুলো সরাসরি পারবে না সেগুলোর ক্ষেত্রে অপশন বাদ দিয়ে সংখ্যা কমিয়ে এনে উত্তর করার চেষ্টা করবে।
সৃজনশীলের ক্ষেত্রে শুরুতে প্রশ্নপত্রটা ২-৩ মিনিট ভালোমতো দেখে নিয়ে কোন ৭টি প্রশ্নের উত্তর করবে তা আগে থেকেই স্থির করে নেবে। তারপর প্রতিটা সৃজনশীল লেখার জন্য ঘড়ি ধরে ১৮ মিনিটের একটা টার্গেট নিয়ে শেষ করার চেষ্টা করবে। সবগুলো সৃজনশীল যেন একই মাপের ও একই স্ট্যান্ডার্ডের হয় সেদিকে খেয়াল রাখবে। ফন্ট কিছুটা বড় করে, লেখা সুন্দর ও পরিষ্কার রেখে এবং লাইন ও প্যারার স্পেসিং ঠিক রেখে গুছিয়ে সৃজনশীল আনসার করবে।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে খাতা জমা দিয়ে হল থেকে সোজা বের হয়ে আসবে। কক্ষ থেকে বের হয়েই বন্ধুদের সাথে প্রশ্ন মিলিয়ে দেখতে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই যে কার কয়টা এমসিকিউ সঠিক হলো বা কে কেমন লিখলো। একটা এমসিকিউ ভুল হলে তা নিয়ে আফসোস করতে গিয়ে পরের পরীক্ষার মানসিক প্রস্তুতি আর কনফিডেন্স একদম নষ্ট করে ফেলবে না। পরীক্ষা যেমনই হোক না কেন, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। ওটা ওখানেই ভুলে গিয়ে সরাসরি বাসায় চলে আসবে। বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে হালকা কিছু খেয়ে অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা ঘুমিয়ে শরীর ও মনকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম দেবে। এরপর পরবর্তী পরীক্ষার জন্য একদম ফ্রেশ মাইন্ডে আবার পড়ার টেবিলে বসবে।
তোমার এই যাত্রার জন্য অনেক অনেক দুআ ও ভালোবাসা রইলো। আল্লাহ যেন তোমার এতদিনের কষ্টকে কবুল করেন, তোমার মেধা ও পরিশ্রমের উত্তম প্রতিদান দেন এবং পুরো পরীক্ষাটা তোমার জন্য অনেক সহজ ও বরকতময় করে দেন। আমিন।