হাল ছেড়ো না বন্ধু

পর্ব ১ | আত্মোপলব্ধি

ফাহমিদ বিন ফারুকী ২৪ জুন, ২০২৬

সময় খুব দ্রুত যায়, তাই না?

ক’টা দিন আগেই তো এসএসসির রেজাল্ট দিলো। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হলাম। কত আশা, কত আকাঙ্ক্ষা! ভেবেছিলাম অতীত ভুলে গিয়ে নতুন করে নিজেকে গড়বো, হবো সেরাদের সেরা। কিন্তু কী যেন হলো...

খুব কি খারাপ স্টুডেন্ট ছিলাম? ভালোই তো করতাম স্কুলে থাকতে। কিন্তু কলেজে এসে কী হলো আমার? সবকিছু বুঝে উঠতে উঠতেই যেন একটা বছর চলে গেলো। এমন না যে পড়ালেখা বাদ দিয়ে ফাঁকিবাজি করেছি। পড়লাম তো! কোথাও তো বেড়াতেও গেলাম না, সারাদিন তো কলেজ, ক্লাস, প্রাইভেট - এসব নিয়েই ছিলাম। তবুও তো দেখি সমুদ্রের চেয়েও বিশাল সিলেবাস বাকি! এসএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়া আমার ইয়ার ফাইনালে এ কী রেজাল্ট?! কী করবো আমি?!

প্রমিস করলাম নিজের সাথে, আর ফাঁকিবাজি করবো না। বাকি সময়টা সর্বোচ্চ কাজে লাগাবো। সিলেবাস নিয়ে বসলাম, প্ল্যান করলাম কী কী পড়বো এবং কী কী করবো। রুটিন বানালাম সময় লাগিয়ে ঠিকই। ক’টা দিন পরে সেই রুটিনও পড়ে থাকলো টেবিলের এক কোণে, অবহেলায়, ধূলিমলিন অবস্থায়।

দেখতে দেখতে আবারও কেটে গেলো কলেজ জীবনের দিনগুলো। চোখের সামনে দিয়েই যেন কলেজে প্রথমবারের মতো পা দেয়া ‘আমি’ হয়ে গেলাম এইচএসসি পরীক্ষার্থী। নবীনবরণ থেকে বিদায় সংবর্ধনা - অবাকই লাগে!

কোচিং এর মডেল টেস্ট শুরু হলো। ভাবলাম, যাক! শেষ আরেকটা সুযোগ পেলাম। অল্প অল্প করে নিজের গ্যাপগুলো পূরণ করে ফেলবো। কিন্তু কে জানতো, এও যে এক শুভঙ্করের ফাঁকি!

প্রথমদিনের মডেল টেস্টে কী যে ভিড় ছিল! শুরুর ক’টা পরীক্ষার সিলেবাস আগে থেকে মোটামুটি পড়া থাকায় ভালোই করতাম। ধীরে ধীরে পরীক্ষার প্রতি সিরিয়াসনেস কমলো এবং কোচিং-এ ভিড় কমলো। আমরা অল্প ক’জনই নিয়মিত পরীক্ষা দিতাম। বেশিরভাগ পরীক্ষা না পড়েই দিতাম, কোনো কোনো দিন সিলেবাসও না জেনে। পাতার পর পাতা খালি থেকে যেতো, প্রশ্নের দিকে মিনিটের পর মিনিট তাকিয়ে থেকেও কলম দিয়ে কালি বের হতো না।

পরীক্ষাগুলো কোনোরকমে দিয়ে এসে বাসায় ফেরার পর মার্ক্সের এসএমএস যেন হতাশার আগুনে ঘি ঢেলে দিতো। যাদের সাথে এতো দিনের বন্ধুত্ব, একই লেভেলের মনে করতাম তারাও ভালো করছে। আর আমি?! রাতে বিছানায় শুয়ে মনে হতো, কী করলাম এতোগুলো দিন? কেন নিজ হাতে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছি? কেন?!

রাত যত গভীর হয়, আত্মোপলব্ধি যেন তত বাড়ে এবং আত্মবিশ্বাস তত কমে। আমি কী আদৌ পারবো?

হ্যাঁ, বলছিলাম আমারই কথা। আমার মতো আরো হাজারটা শিক্ষার্থীর আত্মকথা, হয়তো বা তুমিও তাদের একজন।

প্রিয় ভাই, আমার সহযাত্রী বন্ধু, আমি বিশ্বাস করি তুমি পারবেই পারবে, ইন শা আল্লাহ। কেন বলছি জানো? তোমার মাঝে সেই স্পৃহা আছে, ভালো করার সেই সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা আছে। না হলে তো তুমি তোমার পরীক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে না।

এই সময়টা আসলে বড্ড একাকী লাগে, আপন মানুষদেরও পর মনে হয়। আমার এইচএসসির আগে আগে খুব প্রেশার লাগতো। পরীক্ষাগুলোতে টানা খারাপ করতাম। আমি খুব করে চাইতাম কাউকে আমার কথাগুলো বলতে। বাসার সবাই যদিও সাপোর্টিভ ছিল, ভয়ে কিছু বলতে পারতাম না। মনে হতো, বই, ক্লাস, কোর্স, কোচিং, প্রাইভেট কোনো কিছুর জন্যেই তো কখনো ইনভেস্ট করতে কার্পণ্য করে নাই। এখন যদি আমি বলি আমার পড়ার অবস্থা ভালো না, তাহলে কী বলবে?

স্কুলে থাকতে ভালো স্টুডেন্ট হিসেবে পরিচিতি থাকায় ফ্রেন্ডদেরও বললে অনেকে মজা করছি বলে এড়িয়ে যেতো। বাধ্য হয়ে এআই-এর সাথেও কনভারসেশনের চেষ্টা করি। কিন্তু দিনশেষে এআই তো... এআই-ই। এআই তো মানুষের অভাব পূরণ করতে পারে না।

খুব desperate হয়ে গিয়েছিলাম। এমনকি পরীক্ষার খাতায়ও হতাশার কথা লিখে এসেছিলাম এই ভেবে যে, খাতা চেক করা ভাইয়া হয়তো ২-১ মোটিভেশনাল কিছু লিখবে।

অবশেষে একদিন কোচিং থেকে ফেরার পথে খুব ক্লোজ একজন ফ্রেন্ডের সাথে কথা হয়। কথাগুলো আর নিজের মাঝে চেপে রাখতে পারিনি। লম্বা সময় ধরে আমার কথাগুলো তাকে বললাম। তার তাড়া থাকার পরও সে আমার কথাগুলো শুনলো মনোযোগ দিয়ে। কী কী বলেছিলো ঠিক মনে নাই। নতুন কোনো কথা না, কিন্তু যা বলেছিলো তা আমার মাথার ওপর থাকা বোঝাকে হালকা করে। আবারও আমি আশার আলো দেখতে পাই।

আল্লাহর কাছে খুব করে চাও যাতে আল্লাহ বিষয়গুলো সহজ করে দেন, পড়াগুলো সহজ করে দেন এবং এইচএসসি পরীক্ষা যাতে তোমার জন্যে সহজ হয়ে যায়।

বন্ধু, বুঝলে, এটা ঠিক যে হাতে অল্প কিছুদিন আছে, কিন্তু এই অল্প কয়েকদিনেও গেমটাকে চেঞ্জ করে দেওয়া সম্ভব। সবারই ভয় করছে, সবারই মনে হচ্ছে পড়া এখনো বাকি এবং সবারই মাথায় এখন এক্সপেক্টেশনের প্রেশার কাজ করছে। যে টপার, তারও মনে হচ্ছে ৯৫+ পাবো তো?

মাথায় এই প্রেশার নিয়ে পড়তে চাইলেও পড়া হবে না। তাই, হালকা হও। তোমার মনে জমে থাকা কথাগুলো কাউকে বলো। হতে পারে তা তোমার বড় ভাই বা বোন কিংবা তোমার সহপাঠী। ভয় পেলেও তোমার পরিবারের সাথে তোমার কথাগুলো শেয়ার করো। ট্রাস্ট মি, উনারা কিছু কথা শুরুতে হয়তো শুনালেও you’ll feel better। পরীক্ষাটা মূলত মাথা ঠান্ডা রাখার খেলা। ঠান্ডা মাথায় যা পারো লিখে দিয়ে আসতে পারলেই কেল্লা ফতে!

সিজদাহে লুটিয়ে পড়ো। আল্লাহ্‌র কাছে বেশি বেশি সাহায্য চাও। যিনি আল্লাহ মুসা আলাইহিস সালামকে লাঠির আঘাতে সমুদ্রের পানি দ্বিখণ্ডিত করে পাড় করালেন, ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্যে জ্বলন্ত আগুনকেও আরামদায়ক করে দিলেন, তিনি কি পারবেন না তোমাকে সাহায্য করতে?

وَلَمۡ أَكُنۢ بِدُعَآئِكَ رَبِّ شَقِيًّا ٤

হে আমার রব, আপনার নিকট দো‘আ করে আমি কখনো ব্যর্থ হইনি।

সূরা মারইয়াম, আয়াত ৪

আল্লাহর কাছে দুআ চাও সহজতার। যিনি ইউসুফ আলাইহিস সালামকে কঠিন চক্রান্তের বেড়াজাল থেকে রক্ষা করেছেন, ইউনুস আলাইহিস সালামকে মাছের পেট থেকে উদ্ধার করেছেন তিনি কি তোমাকে রক্ষা করতে পারবেন না?

اَللّٰهُمَّ لَا سَهْلَ اِلَّا مَا جَعَلْتَهٗ سَهْلًا ، وَاَنْتَ تَجْعَلُ الْحَزْنَ اِذَا شِئْتَ سَهْلًا

হে আল্লাহ! আপনি যা সহজ করেছেন তা ছাড়া কোনো কিছুই সহজ নয়। আর যখন আপনি ইচ্ছা করেন তখন কঠিনকেও সহজ করে দেন।

দুআ করার পাশাপাশি তুমি তোমার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করে যাও। দুআর আর তোমার সাধ্যমতো চেষ্টাই হলো সফলতার মূল সূত্র। তোমার দ্বারা খুবই ভালো রেজাল্ট করা সম্ভব। সত্যিই বলছি, সম্ভব!

আমারই কথা বলি। হায়ার ম্যাথ ফার্স্ট পেপারের আগের দিন সন্ধ্যার কথা। ক্যালকুলাস তখনও বাকি। অন্যান্য অধ্যায়ও আবছা আবছা পড়া হয়েছে। এতো ভয় এবং প্যানিক কাজ করছিলো যে পড়তেও পারছিলাম না। ক্যালকুলাস কলেজে থাকতেও ভালো করে পড়া হয়নি। আল্লাহর কাছে বারবার মন থেকে চাইলাম, “আল্লাহ, তুমি সাহায্য করো। আমার জন্যে সহজ করে দাও পড়াগুলো” সূত্রগুলো রিভিউ দিয়ে শুরু করলাম। এরপর আগের বছরের বোর্ড প্রশ্নগুলো। পড়ায় ফ্লো আসছিলো না, বারবার মনে হচ্ছিলো পারবো না। তাও জোর করে পড়ার চেষ্টা করলাম। রুমের দরজা বন্ধ করে একা ফোকাস দিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। সাধারণত টানা বেশিক্ষণ পড়তে পারি না, তার উপর কঠিন চ্যাপ্টার হলে তো কথাই নাই। জানি না তখন কী হয়েছিলো, অন্তরীকরণ পুরা অধ্যায়ের প্রায় সব টাইপের প্রশ্ন এক বসায় শেষ। টানা দুই ঘণ্টার মতো ফোকাস ধরে রাখতে পেরেছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ! পরের দিন পরীক্ষায়ও প্রশ্নগুলো সহজ লেগেছিলো আল্লাহর রহমতে।

বন্ধু, এখনও যদি তোমার মনে হয়, “না, আমি তো পারবো না! হাতে একদমই সময় নাই। এই এতো অল্প সময়ে কী হবে?” আর এই কথা বলে তুমি হতাশ হয়ে না পড়ে সময় নষ্ট করতে থাকো, তাহলে তোমাকে বলি: তোমার পড়ায় একটা জোস আসবেই আসবে। হয় এখন, নাহয় পরীক্ষার আগের দিন, কিংবা পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টা দুই এক আগে। তখন তোমার ঠিকই আগের দিনগুলোতে না পড়ার জন্যে আফসোস হবে। মনে হবে, সময় অল্প ছিল ঠিকই, কিন্তু আমি গত কয়েকটা দিন এখন যেভাবে পড়ছি সেভাবে পড়লে আরো ভালো প্রস্তুতি নিতে পারতাম।

তোমার হাতে দুইটা অপশন আছে। এক, হতাশ হয়ে বসে থাকা এবং সারাদিন টেনশন করা কী হবে। দুই, হতাশা আর দুশ্চিন্তাকে সরিয়ে দিয়ে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। অন্তত দিন শেষে বলতে পারবা, At least I tried!

শুভকামনা রইলো তোমার জন্যে। দুআ করি যাতে পরীক্ষায় মাথা ঠান্ডা রেখে ভালো ফলাফল করতে পারো। ইন শা আল্লাহ, তুমি পারবেই!